ইসলামে শালীনতাবোধ

আগের সংবাদ

ইসি কি প্রবাসীদের ভোটদানের কথা কিছু ভাবছে?

পরের সংবাদ

জন্মদিন

শাইখ সিরাজ: এক অনন্য ব্যক্তিত্ব

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৩ , ৫:৪১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৩ , ৫:৪১ পূর্বাহ্ণ

শাইখ সিরাজের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ-পরিচয় তখনকার সিদ্ধেশ্বরীর গলিতে অবস্থিত চ্যানেল আইয়ের অফিসে। তার আগেই বিটিভির ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শাইখ সিরাজ এ দেশের মানুষ, বিশেষ করে গ্রামের কৃষিজীবী মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। টেলিভিশন, বিশেষ করে স্যাটেলাইট টেলিভিশনকে মানুষ বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই মনে করত প্রথম। এমনকি বিটিভি সংবাদ পরিবেশনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হলেও, তার অধিক পরিচিতি ছিল সে সময়ের নাটকের জন্য। কেবল বাংলাদেশের মানুষ নয়, সে সময় ভারত, বিশেষ করে ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের মানুষও মুখিয়ে থাকত বিটিভির নাটক দেখার জন্য। সেই নাটকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তখন এক তরুণ টেলিভিশন উপস্থাপক তাঁর কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠানকে প্রায় সমান জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। তিনি আর কেউ নন, আজকের স্বনামধন্য টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ।

তাঁকে অবশ্য একজন স্বনামধন্য টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব বলে অভিহিত করলে ভুল হবে। বরং তাঁকে একজন কৃষিব্যক্তিত্ব বলা যায়। বাংলাদেশের কৃষিতে যে আধুনিক ভাবনাচিন্তার প্রসার ঘটেছে, তাকে তিনিই সফলভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এ দেশের কৃষকদের সঙ্গে। শুধু কৃষি উৎপাদন-বপন, ফলন, বিপণনই নয়; কৃষকের সঙ্গে এ দেশের অর্থনীতির যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে এবং তার সঙ্গে ওই গ্রামের এক কৃষকেরও যে ভূমিকা রয়েছে, তাও তিনি তুলে এনেছেন চ্যানেল আইতে তাঁর কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’-এ।

নগরজীবনেও কৃষি যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, তা তিনি দেখিয়েছেন তাঁর ‘ছাদ কৃষি’ অনুষ্ঠানমালায়। তাঁর ছাদ কৃষি অনুষ্ঠানমালা নগরের মধ্যে সজীব প্রাণের সৃষ্টি করেছে। নগরের পরিবেশের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে প্রবাস জীবনেও কৃষি যে আনন্দের অনুষ্ঠান হতে পারে, তারও প্রকাশ ঘটেছে তাঁর অনুষ্ঠানমালায়।

কিন্তু আমার কাছে যেটা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে তা হলো, দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে কৃষক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও সেই অর্থনীতির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে, বাজেট প্রণয়নে অথবা কৃষি নীতি নির্ধারণে কৃষকের যে কোনো ভূমিকা ছিল না–সেটা তিনি চ্যালেঞ্জ করে সেই ক্ষেত্রে কৃষককেও তুলে এনেছেন সামনে। প্রতি বাজেটের আগে-পরে কৃষককে দিয়ে তিনি বাজেট সম্পর্কে তাদের ভাবনা বলিয়েছেন। নীতিনির্ধারকদের ওই কৃষকদের সামনে দাঁড় করিয়ে তাদের কথা শুনিয়েছেন। খোদ অর্থমন্ত্রীকেও তিনি প্রায় প্রতি বাজেটকালে কৃষকদের সামনে দাঁড় করিয়েছেন।

সংসদ সদস্য হিসেবে আমার শাইখ সিরাজের ‘কৃষকের বাজেট’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে গ্রামের কৃষকদের ভাবনা, তাদের প্রশ্ন, তাদের উদ্বেগ, তাদের সমস্যা-সমাধানের উপায় ইত্যাদি বিষয় জানার সৌভাগ্য হয়েছিল।

মওলানা ভাসানীকে দেখতাম কৃষক আন্দোলন সংগঠিত করতে কৃষকদের অধিকার, জাতীয় রাজনীতিসহ তাদের ওপর পরিচালিত শোষণ-বঞ্চনা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করার পাশাপাশি কোন ফসল কখন লাগাতে হবে, কৃষকের গরুর অসুখ হলে কোন ব্যবস্থা নিতে হবে, বন্যা-প্লাবনে কৃষককে কীভাবে বাঁচতে হবে– এসব কথা সহজ-সরলভাবে বুঝিয়ে দিতেন। কৃষক তাঁর কথা বুঝত, তিনিও তাদের কথা বুঝতেন। ওই যে কৃষকের সঙ্গে মিশে যাওয়া, তাদেরকে বোঝা, তাদের ভাষায় কথা বলা– এসব গুণ আমি দেখতে পেয়েছি শাইখ সিরাজের মধ্যে। এ ক্ষেত্রে তিনি টেলিভিশন মাধ্যমকে যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তা নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। ওইসব অনুষ্ঠানে তাঁর ভাষার মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই। এমনকি টেলিভিশন যে ভাষায় কথা বলে, সে পথেও তিনি হাঁটেননি। তিনি কৃষকদের সঙ্গে বন্ধন তৈরি করতে নিজের ভাষা তৈরি করে নিয়েছেন, যা কৃষকদের জন্য যেমন বোধগম্য, এমনকি শহুরে মানুষ, যারা তাঁর দ্বারা ছাদ কৃষি অথবা আঙিনা কৃষিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, তাদের কাছেও বোধগম্য।

শাইখ সিরাজ তাঁর অনুষ্ঠানে কেবল ফসল উৎপাদন নয়; গরু, হাঁস-মুরগির খামার, মৎস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে কৃষির সঙ্গে সংযুক্ত বিভিন্ন বিষয় তুলে এনেছেন। এর ফলে ওইসব অনুষ্ঠান এক ধরনের সামগ্রিকতা পেয়েছে। লেখাপড়া জানা তরুণদেরও তিনি উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছেন। তাদের প্রয়াস ও উদ্ভাবনী কাজকে অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের কৃষিতে নারীর ভূমিকা আগেও ছিল। এখন নানা কারণে তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই নারী কৃষকদের, নারী কৃষি শ্রমিকদের সামনে তুলে নিয়ে আসা শাইখ সিরাজের অন্যতম সাফল্য। তার চেয়ে বড় কথা, এ দেশের কৃষকরা, বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষক, ভূমিহীন-ক্ষেতমজুর যারা সমাজে ব্রাত্যজন, তারাও যে আনন্দ করে, আনন্দ করতে পারে– গ্রামবাংলার সেই প্রাচীন ঐতিহ্যকে শাইখ সিরাজ তাঁর কৃষকের ঈদ আনন্দ অথবা বৈশাখী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন।

টেলিভিশন মাধ্যমে পৃথিবীতে বহু খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। তারা কেউ উপস্থাপক, কেউ সংবাদ বিশ্লেষক, কেউ সংবাদ পাঠক বা কেউ অন্য কোনো ক্ষেত্রে নিজেদের বিশেষ পরিচয়-বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। সেভাবে পরিচিতি পেয়েছেন। শাইখ সিরাজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য তাঁর ট্রেডমার্ক কৃষিবিষয়ক হলেও, তিনি দশভুজা। টেলিভিশনে সব ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর অনন্যতার পরিচয় দিয়েছেন। এ কারণে তিনি যে বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন– একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, কোনো ক্ষেত্রেই তাঁকে বেমানান মনে হয়নি। তিনি আরও এগিয়ে যাবেন, নতুন নতুন সম্মানে ভূষিত হবেন– তাঁর ৭০তম জন্মদিনে এটাই কামনা। শুভ হোক তাঁর জন্মদিন।

রাশেদ খান মেনন: সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, রুপান্তর প্রতিদিন এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়